২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৮

কাবুলের কেন্দ্রস্থল ‘ভূতুড়ে শহর’, বিমানবন্দরে আফগানদের দেশ ছাড়ার মরিয়া চেষ্টা

প্রকাশ : সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১

নিউজ ডেস্ক

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পরদিন শহরের রাস্তাঘাট হয়ে পড়ে জনশূন্য। শহরের বড় অনেক দোকানের পাশাপাশি ছোট ক্যাফেগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। নগরীর নিরাপত্তা রক্ষীদের খোঁজ মেলেনি।

সোমবার সকালে শহরে এমন চিত্র দেখা গেলেও বিপরীত চিত্র দেখা গেছে কাবুল বিমানবন্দরে। সেখানে বিরাজ করছে পুরো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।

তালেবান শাসন ফিরে আসার আতঙ্কে প্রাণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর হিড়িক পড়ে গেছে আফগানদের মধ্যে। কাবুলের বিমানবন্দরে ছুটে যাচ্ছে মানুষ। একে অপরকে ঠেলে যে ভাবেই হোক বিমানে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।

কাবুল বিমানবন্দর জনসমুদ্রে পরিণত হওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাতেই দেখা গেছে, বিমানে কে আগে উঠবেন তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি। অনেককে আবার সিঁড়ির রেলিংয়ে ঝুলেই বিমানের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তবে এসব ভিডিও যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

সেখানে অন্তত পাঁচ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে তারা গুলিতে না ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও সহযোগী দেশগুলোর কূটনীতিক এবং কর্মীদের সরিয়ে নিতে কাবুল বিমানবন্দরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মার্কিন সেনারা। তারা এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

যারা রাজধানী থেকে পালাতে চাইছেন তাদের দূরে সরিয়ে রাখতে বিমানবন্দরের রানওয়েতে কাঁটাতারের বেড়াও দিচ্ছে সেনারা।

কাবুল তালেবানের দখলে চলে যাওয়া দ্বিতীয় দিনে পড়েছে। প্রথমদিন থেকে রাজধানী কাবুলের পরিস্থিতি কেমন তা কয়েকটি ছবি দিয়ে তুলে ধরেছে বিবিসি। তাতে দেখা গেছে, কাবুলের রাস্তায় রাস্তায় তালেবান।

কাবুলের বিমানবন্দর মানুষে ঠাসা হলেও শহরের পথঘাট সব ফাঁকা। কাবুলে প্রথম সকালটা যে আফগানদের জন্য স্বস্তির ছিল না আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যেমের খবরে বলা হয়েছে,তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে কাবুলে। দোকান-পাট সব বন্ধ হয়ে কাবুল ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। দোকান মালিকরা এরপর গ্রাহক পাবেন কোথায় তা নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন দোকান মালিক বলেছেন,   “শহরে তালেবান ঢুকেছে। আমি ভয়ে আছি। কিন্তু আমাদের সবাইকে প্রেসিডেন্ট গানির ছেড়ে চলে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও চরম খারাপ করে তুলেছে।”

কাবুলের সরকারি দপ্তরগুলো ফাঁকা পড়ে আছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। প্রায় সব কূটনীতিক তাদের পরিবার নিয়ে শহরটি ছড়ে চলে যাওয়ায় নগরীর ওয়াজির আকবর খান কূটনৈতিক এলাকা জনশূন্য হয়ে আছে। 

এমনিতে অত্যন্ত সুরক্ষিত এই এলাকাটির চেকপয়েন্টগুলোতে এখন অল্প কয়েকজন রক্ষী আছেন। কিছু গাড়িচালক নিজেরাই গাড়ি থেকে বের হয়ে চেকপয়েন্টের বাধা সরিয়ে গন্তব্যের পথে রওনা হন।

এই এলাকায় নিজের নান রুটির দোকানে বসা গুল মোহাম্মদ হাকিম বলেন, “এখানে বসে ফাঁকা রাস্তা দেখতে অদ্ভুত লাগছে, দূতাবাসের ব্যস্ত গাড়িবহর, মেশিনগান বসানো বড় বড় গাড়ি আর নেই।

“রুটি বানাতেই এখানে এসেছি, কিন্তু আয় তেমন একটা হবে না। যে নিরাপত্তা রক্ষীরা আমার বন্ধু ছিল তারা চলে গেছে।” সে সময় পর্যন্ত কোনো ক্রেতার দেখা পাননি তিনি, কিন্তু তাদের অপেক্ষায় চুলা জ্বালিয়ে রেখেছেন।

“আমার প্রথম কাজ হচ্ছে দাঁড়ি রাখা, কীভাবে এগুলোকে দ্রুত বাড়ানো যায় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আছি। স্ত্রী ও মেয়েদের জন্য যথেষ্ট বোরকা আছে কিনা তাও দেখে রেখেছি আমরা,” বলেন হাকিম।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তালেবান আমলে পুরুষদের দাঁড়ি কাটার অনুমতি দেওয়া হতো না এবং নারীদের জনসম্মুখে আপাদমস্তক বোরকা ঢাকা অবস্থায় চলাফেরা করতে হতো।

নগরীর চিকেন স্ট্রিটের সব দোকান বন্ধ ছিল। এখানে আফগানিস্তানে তৈরি কার্পেট, হস্তশিল্প ও অলঙ্কারের দোকানের পাশাপাশি ছোট ছোট ক্যাফে আছে।

এখানে একটি কার্পেট ও কাপড়ের দোকানের মালিক শেরজাদ করিম স্টানেকজাই জানান, মালপত্র রক্ষার জন্য দোকানের শাটার ফেলে ভেতরে ঘুমিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

“আমি পুরোপুরি মর্মাহত অবস্থায় আছি। তালেবান শহরে প্রবেশ করায় আমি শঙ্কিত, কিন্তু আমাদের সবাইকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে (প্রেসিডেন্ট আশরাফ) গনির চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে খারাপ হয়েছে,” বলেন তিনি।

“এই যুদ্ধে সাত বছরে তিন ভাইকে হারিয়েছি আমি, এখন আমাকে আমার ব্যবসা রক্ষা করতে হবে।”  তার পরবর্তী ক্রেতা কোথা থেকে আসবেন সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই বলে জানান তিনি।

“এখানে বিদেশি কেউ আর নেই, কোনো বিদেশি এখন আর কাবুলে আসবেনও না,” বলেন তিনি। এক তালেবান নেতা জানিয়েছেন, আফগানদের দৈনন্দিন কার্যক্রম শুরু করতে দিতে ও বেসামরিকদের আতঙ্কিত না করতে তাদের যোদ্ধাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

“আরও অনেক ভালোভাবে স্বাভাবিক জীবন শুরু হবে, আপাতত এটুকুই বলতে পারি,” হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে রয়টার্সকে বলেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ট্যাগ :